অর্থ পরিশোধে বিলম্ব

এলএনজি সরবরাহে দরপত্র ডেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাচ্ছে না পেট্রোবাংলা

চলমান রমজান ও গ্রীষ্মে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সময়মতো অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য দরপত্র ডেকেও তেমন সাড়া মেলেনি।

চলমান রমজান ও গ্রীষ্মে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সময়মতো অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য দরপত্র ডেকেও তেমন সাড়া মেলেনি। এমনকি একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করেও যোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচন করতে পারেনি সংস্থাটি।

দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ২০২৫ সালে মোট ৯০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা পেট্রোবাংলার। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি দুটি দেশ কাতার ও ওমান থেকে ৫৬ কার্গো এবং স্পট মার্কেট থেকে ৩৪ কার্গো এলএনজি কেনার পরিকল্পনা। এর বাইরে শুধু রমজানে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত আরো চার কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এর জন্য ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এ পরিমাণ অর্থ পেট্রোবাংলার কাছে নেই। তাই টাকা চেয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ৬ মার্চের (আজ) মধ্যে অর্থ না পেলে অতিরিক্ত চার কার্গো এলএনজি আমদানি সম্ভব নয়। পেট্রোবাংলাকে অবশ্য গতকাল ১ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সেটি বকেয়া পরিশোধ, নাকি নতুন এলএনজি আমদানির জন্য দেয়া হয়েছে তা জানা যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, গ্রাহকের কাছে বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া থাকায় নগদ অর্থের সংকটে পড়েছে সংস্থাটি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বকেয়া টাকা আদায়ে রয়েছে ধীরগতি। ফলে অর্থ সংকটের কারণে এলএনজি সরবরাহকারীদের বকেয়া ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছে না পেট্রোবাংলা। সে কারণে স্পট মার্কেট থেকে চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি আমদানিতে যে দরপত্র আহ্বান করা হয়, তাতে আর আগের মতো কোম্পানি অংশ নিচ্ছে না।’

বিষয়টি জানিয়ে সম্প্রতি বিপিডিবিকে একটি চিঠি দিয়েছে পেট্রোবাংলা। চিঠির অনুলিপি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও দেয়া হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশের ভেতরে বিদেশী তেল-গ্যাস উত্তোলন কোম্পানি (আইওসি), কাতার এনার্জি ও স্পট মার্কেট এলএনজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো বকেয়া বাবদ ৭৫০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার পায়। সে কারণে কয়েকবার দরপত্র আহ্বান করলেও ভালো ও গ্রহণযোগ্য কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। এমনকি বিল পরিশোধে বিলম্বের কারণে নিয়মিত এলএনজি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোও এখন আর দরপত্রে অংশ নিচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলএনজি আমদানিতে অর্থের সংকট রয়েছে এটা সত্য। তবে বিষয়টি যে থেমে আছে এমনটি নয়। আজকেও (গতকাল) দুটি কার্গো কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। কোম্পানি তো অংশগ্রহণ করছে। পেট্রোবাংলাকে আজকেও (গতকাল) ১ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। বিপুল বকেয়ার ফলে ধীরে ধীরে এগুলোর সমাধান হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি চলতি মাসের মধ্যে আইওসি ও বিদেশী সরবরাহকারীদের যে ৭০০ মিলিয়ন ডলারের মতো বকেয়া, সেগুলো পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করার। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকেও সহায়তা নেয়া হচ্ছে।’

চলতি রমজানে লোডশেডিং মোকাবেলায় বিদ্যুতে (অফগ্রিড-অনগ্রিড) প্রায় সাড়ে ১২শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে পেট্রোবাংলার। যদিও এখন পর্যন্ত গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় ৯৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়েছে। আর অফগ্রিডে সরবরাহ ছিল ১০৯ মিলিয়ন ঘনফুট। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে এরই মধ্যে আশুগঞ্জ সার কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সার কারখানাগুলোয় ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ থাকবে পেট্রোবাংলার।

দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সবচেয়ে বেশি বিতরণ কোম্পানি তিতাসের আওতাধীন। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করলেও নিয়মিত বিল না পাওয়ার অভিযোগ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। এখনো কোম্পানিটি প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা পাবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছে।

জানতে চাইলে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছে মোট ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার মতো বকেয়া ছিল। এরই মধ্যে ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে কেন্দ্রগুলো। বর্তমানে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার মতো বকেয়া রয়েছে। সেই বকেয়া আদায়েও আমরা নিয়মিত তাগাদা দিয়ে যাচ্ছি।’

এদিকে তীব্র অর্থ সংকটে ভুগতে থাকা পেট্রোবাংলা রমজানে গ্যাস সরবরাহ সংকট মোকাবেলায় দুই কার্গো এলএনজি কিনছে। সুইজারল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর থেকে তা আনার অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। স্পট মার্কেট থেকে এ দুই কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৯৬ কোটি ৩৭ লাখ ১৯ হাজার ৬৮০ টাকা। সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে গতকাল অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়া হয়।

আরও